Friday, May 25, 2012

হডজকিন-হাক্সলি মডেলঃ নিউরনের প্রকৃত রূপ!

১৯৬৩ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী-দ্বয়ের নাম স্যার অ্যালান হডজকিন এবং স্যার এন্ড্রু হাক্সলি, যাদের অসাধারণ বৈজ্ঞানিক গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫২ সালে জার্নাল অফ ফিজিওলজিতে। তারাই মানুষের সামনে প্রথমবারের মত উপস্থাপন করেছিল অ্যাকশন পটেনশিয়ালের গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা, নিউরনে অনুরণনের পিছনের ঘটনা, “কিভাবে ঘটে? কেন ঘটে?, কখন ঘটে?”। মানুষের বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সমগ্র মানব সভ্যতা মুগ্ধ হয়ে থাকলেও ১৯৫২ সালের আগ পর্যন্ত মানুষের জানা ছিল না, কোন মৌলিক নিয়ম অনুসরণ করে কাজ করে মানুষের স্নায়ুতন্ত্র। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, মানুষ বুদ্ধিমান, মানুষ এটা পারে, ওটা পারে, কিন্তু কিভাবে পারে তা মানুষ জানতো না। আজও আমরা জানিনা এমন অনেক কিছুই, তবে যে কটা ঘটনা জানতে পেরেছি, তাদের মধ্যে অন্যতম এই একটি, অ্যাকশন পটেনশিয়ালের ব্যাখ্যা, নার্ভের ইলেক্টিকাল বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জ্ঞানার্জন। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত সেই বিখ্যাত গবেষণা পত্রে বিজ্ঞানী কোল-মারমন্ট উদ্ভাবিত ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প পদ্ধতিতে পরীক্ষণ থেকে প্রাপ্ত মেমব্রেনের ইলেকট্রিকাল বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে হডজকিন-হাক্সলি উপস্থাপন করেছিলেন নিউরন বা স্নায়ুকোষের গাণিতিক মডেল, যে মডেলটি দিয়ে মানুষের স্নায়ুতন্ত্রকে প্রথম সত্যিকার অর্থে বুঝতে পারার শুরু। মস্তিষ্ক- প্রাণীর মাথার খুলির মধ্যে বসে থাকা নরম তুলতুলে হালকা গোলাপি রঙের সেরেব্রোস্পাইনাল ফ্লুয়িডে ভেসে থাকা কোষ পিন্ড নয় কেবল, এর প্রত্যেকটি কোষ একেকটি কার্যক্ষম ইলেকট্রিকাল ইউনিট, পুরো মস্তিষ্কটা আসলে একটি বিশাল সার্কিট, তথ্য সঞ্চালনকারী কোষসমূহের নেটওয়ার্ক!
এই ব্লগটির উদ্দেশ্য নিউরন নামের সংবেদনশীল কোষটির আড়ালে লুকিয়ে থাকা মৌলিক ইলেকট্রিকাল ইউনিটের কাঠামোটির প্রতি আলোকপাত করা, যা অনুধাবন করতে মানুষের লেগে গেছে ১৭৯ বছর! এর আগে কয়েকটি পর্বে দেখিয়েছি নিউরন কিভাবে কাজ করে? এবং গাণিতিক ভাবে নিউরনের কাজ বা অ্যাকশন পটেনশিয়ালের ব্যাখ্যা দানকারীদের হাত ধরে নিউরাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর জন্মকথা । ঐ লেখাগুলোতে উল্লেখ করেছিলাম, মেমব্রেন পটেনশিয়াল সৃষ্টিতে মেমব্রেনে বিভিন্ন আয়নের প্রবেশযোগ্যতার ভূমিকার কথা। সেখানেই উল্লেখ করেছিলাম ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিকের কথা, যা অ্যাকশন পটেনশিয়াল সৃষ্টির মেকানিজম ব্যাখ্যায় কাজে লেগেছিল। এই পর্বে দেখাব, কিভাবে ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিক ব্যবহার করে হডজকিন হাক্সলি নিউরনের গাণিতিক মডেল এবং এর কাজ ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়েছিল। আসুন সংক্ষেপে দেখে নিই নিউরনের কোষপর্দার ইলেকট্রিকাল বৈশিষ্ট্য কেমন? এই ছবিটি সরাসরি হডজকিন –হাক্সলির মূল গবেষণাপত্র থেকেই তুলে দিলাম।

চিত্রঃ নিউরন মেমব্রেনের হডজকিন-হাক্সলি প্রদত্ত গাণিতিক মডেল
কোষ পর্দার এই ইলেকট্রিকাল ইকুইভ্যালেন্ট মডেলের দিকে তাকালে বোঝা যায়, নিউরনের কোষ পর্দার মূলত দুই ধরণের ইলেকট্রিকাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
১. পরিবাহকত্ব বা কন্ডাকটেন্স
২. ধারকত্ব বা ক্যাপাসিটেন্স
বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাওয়ার আগে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের জীববিজ্ঞান এবং পদার্থ বিজ্ঞান থেকে কিছু বেসিক কনসেপ্ট মাথার মধ্যে একবার ঝালিয়ে নিই। আমরা পড়েছিলাম, কোষপর্দার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মডেল হল লিপিড বাইলেয়ার মডেল, যাতে স্যান্ডউইচের মত মাঝখানে দুটি লিপিড লেয়ার, আর তার বাইরের দিকে থাকে হাইড্রোফিলিক বা পানি-গ্রাহী পদার্থের আস্তরণ। লিপিডকে বলা হল হাইড্রোফোবিক পদার্থ, যা অর্থ হল, লিপিড পানি এবং সকল প্রকার আয়নকে বিকর্ষণ করে। অর্থাৎ পানি এবং সকল প্রকার আয়ন লিপিড লেয়ারকে ভেদ করে কোষের বাইরে বা ভিতরে যেতে পারে না। এই অভেদ্য লিপিডের লেয়ারটিই কোষপর্দার ভিতরে এবং বাহিরে বিদ্যমান আয়নকে (চার্জকে) পৃথক করে রেখেছে, যা বৈদ্যুতিক ধারকের বা ক্যাপাসিটরের অনুরূপ কাজ করে। এখন আমরা উচ্চমাধ্যমিকের পদার্থবিজ্ঞান বই থেকে ক্যাপাসিটেন্সের ধারণাটা একটু মনে করে নিই। ক্যাপাসিটেন্সের কাজ হল একটি ডাইইলেক্ট্রিক বা অপরিবাহী পদার্থ দ্বারা অপরিবাহকের দুইপাশে কিছু চার্জকে পৃথক করে জমিয়ে রাখা। কি অদ্ভুত মিল, তাই না? কোষপর্দার লিপিড লেয়ারও তো কোষের ভিতরে এবং বাহিরে কিছু আয়ন বা চার্জকেই পৃথক করে ধারণ করে। তাহলে বলা চলে, কোষপর্দা একটা ক্যাপাসিটরের মত কাজ করে।
প্রশ্ন হল, লিপিড বাইলেয়ার ভেদ করে যদি পানি এবং আয়ন চলাচল করতে নাই পারে, তাহলে কোষীয় পর্যায়ে খাবার, লবণ এবং পানির আদান প্রদান হয় কি করে? এগুলো তো কোষের ভিতরে ঢুকতে বা বের হতে হবে! এজন্য ক্যাপাসিটরের মাঝে মাঝে কিছু প্রোটিন নির্মিত আয়ন চ্যানেল আছে, ঐ চ্যানেলগুলো যখন খোলা থাকে তখন কোষপর্দা ভেদ করে আয়ন এপাশ থেকে ওপাশে চলাচল করতে পারে। আচ্ছা, পরিবাহকের মধ্য দিয়েও তো ধনাত্মক বা ঋণাত্মক আধান চলাচল করতে পারে, তাই না? তাহলে কোষপর্দায় উপস্থিত এই আয়ন চ্যানেল গুলো খোলা অবস্থায় আসলে কাজ করে পরিবাহকের মত! তারমানে, কোষপর্দাটি মূলত ক্যাপাসিটর হলেও এতে জায়গায় জায়গায় আয়ন পরিবহনের জন্য পরিবাহকও আছে। আর পরিবাহক যখন আছে, তখন কোষপর্দার বা মেমব্রেনের পরিবাহকত্ব বা কন্ডাক্টেন্সও আছে।
হডজকিন এবং হাক্সলি যখন তাদের গবেষণা করেছেন, তখন এই লিপিড বাইলেয়ার মডেলের কথা, জানা ছিল না ভালো ভাবে। তবে জানা ছিল কোষপর্দার কন্ডাক্টিভ এবং ক্যাপাসিটিভ বৈশিষ্ট্যের কথা। এটা জানায় কিন্তু একক কৃতিত্ব হডজকিন এবং হাক্সলির নয়। বরং কোষপর্দার লিপিড বাইলেয়ার মডেলের কথা না জানলেও ১৯০২ সালে বার্নেস্টাইন প্রদত্ত অনুকল্পেই তিনি উল্লেখ করেছিলেন কোষ পর্দার পটাসিয়াম(আয়নের) প্রবেশযোগ্যতার কথা, যাকে ইলেকট্রিকাল কন্ডাক্টেন্সের অনুরূপ চিন্তা করা যায়। পরবর্তী সময়ে মেমব্রেন পটেনশিয়াল পরিবর্তনের গ্রাফ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মানুষ বুঝতে পারে, কোষপর্দার কেবল পরিবাহকত্ব নয়, ধারকত্বও আছে, যা স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলে মেমব্রেন পটেনশিয়াল কার্ভে। কোষপর্দার পরিবাহকত্ব এবং ধারকত্ব নিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পরীক্ষণ চালিয়েছেন বিজ্ঞানী কোল এবং কার্টিস, যা প্রকাশিত হয়েছে ১৯৩৯ সালে। জার্নাল অফ সেল বায়োলজিতে প্রকাশিত কেনেথ এস. কোল এবং হোয়ার্ড জে. কার্টিসের গবেষণা পত্রে দেখান হয়, অ্যাকশন পটেনশিয়াল ঘটাকালে নার্ভ মেমব্রেনের ক্যাপাসিটেন্সের পরিবর্তন ঘটে মাত্র ২% যেখানে পরিবাহকত্বের পরিবর্তন লক্ষণীয় পরিমাণে বেশী, ১০০০ ওহম/বর্গ সেমি. থেকে মাত্র ২৫ ওহম/বর্গ সেমি. তে নেমে আসে, অর্থাৎ ৯৭.৫% কমে যায়। এখান থেকে অনুধাবন করা যায়, অ্যাকশন পটেনশিয়াল ঘটাকালে মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কারেন্টের মুখ্য অংশ আয়নিক কারেন্ট, ক্যাপাসিটিভ নয়। এই গবেষণার পূর্বে স্থিতিশীল অবস্থায় কোষপর্দার পরিবাহকত্ব নিয়ে গবেষণা চালিয়েছিলেন হডজকিন এবং কোল, তাদের দুজনের যৌথ প্রচেষ্টায় জানা সম্ভব হয়েছিল, নিষ্ক্রিয় অবস্থায় কোষপর্দায় থাকে ১০০০ ওহম/বর্গ সেমি রোধক।
কোষ পর্দার মধ্য দিয়ে যেরকম কারেন্টই প্রবাহিত হোক না কেন, তা ঘটে আয়নের এপার ওপার পারাপারের জন্যই। হডজকিন-হাক্সলি আয়নের প্রবেশযোগ্যতার উপর মেমব্রেন পটেনশিয়ালের প্রভাবকে সংক্ষিপ্ত ভাবে উপস্থাপন করেছেন এভাবে,
“প্রথমত, ডিপোলারাইজেশনের কারণে খুব সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কোষপর্দায় সোডিয়াম প্রবেশযোগ্যতা বেড়ে যায় বহুগুণে এবং পটাসিয়ামের জন্য বাড়ে একটু ধীর গতিতে। দ্বিতীয়ত, এই পরিবর্তন ঘটে পর্যায়ক্রমে এবং মেমব্রেনের রিপোলারাইজেশনের মাধ্যমে এটা ফিরে যেতে পারে আগের অবস্থায়। কোষপর্দায় আয়নের প্রবেশযোগ্যতার এই পরিবর্তন অ্যাকশন পটেনশিয়াল এবং তার পরবর্তী নিস্ক্রিয়াবস্থা ঘটানোর জন্য উপযুক্ত কিনা, সে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সোডিয়াম এবং পটাশিয়ামের মেমব্রেন ভোল্টেজ এবং সময় নির্ভরশীল পরি-বহনযোগ্যতা বুঝে ওঠা প্রয়োজন”।
মানুষ হডজকিন-হাক্সলির আগে থেকেই মেমব্রেনের কন্ডাক্টেন্স, ক্যাপাসিটেন্স সম্পর্কে জানলেও এগুলো পরিমাপ যোগ্য হতে হবে, তা না হলে জানা অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। বৈজ্ঞানিক গবেষণার এটি অন্যতম একটি মূল শর্ত, পরিমাপযোগ্যতা। এই পরিমাপযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প পরীক্ষণের মাধ্যমে। কিভাবে তা জানতে শুরুতেই বোঝা প্রয়োজন, ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিক বলতে আসলে কি বোঝায়?
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিকটির নামের সাথেই তার অর্থ বলে দেয়া আছে, এর কাজ হল, সেল মেমব্রেনের ভোল্টেজকে একটি নির্দিষ্ট মানে স্থির রাখা। অর্থাৎ, বাইরে থেকে আসা কোন স্টিমুলেশনের কারণে যখন মেমব্রেন পটেনশিয়ালের মান পরিবর্তিত হবার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন একটি নেগেটিভ ফিডব্যাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেমব্রেন পটেনশিয়ালের পরিবর্তন রোধ করে। একটি অ্যাকশন পটেনশিয়ালের ডিপোলারাইজেশন এবং রিপোলারাইজেশন প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে চক্রটি সমাপ্ত হতে সময় লাগে মাত্র ৫ মিলি সেকেন্ড। এতো অল্প সময়ের মধ্যে এটি একাধারে স্থান এবং সময়ের উভয়ের সাপেক্ষে পরিবর্তিত হয়। অ্যাকশন পটেনশিয়াল অ্যাক্সনের মেমব্রেনের দৈর্ঘ্য বরাবর প্রবাহিত হচ্ছে, প্রবাহিত হচ্ছে একটি নিউরন থেকে আরেকটি নিউরনে। একই সাথে এটি পরিবর্তিত হচ্ছে সময়ের সাথে সাথেও। যখন একটি নার্ভ মেমব্রেনের পটেনশিয়াল (Vm) নামক একটি নির্ভরশীল চলক (Dependent variable) একই সাথে দুটি স্বাধীন চলকের (Independent variable), মেমব্রেনের দৈর্ঘ্য(L) এবং সময় ( t ) এর উপর নির্ভর করে, তখন কেবলমাত্র মেমব্রেন পটেনশিয়াল, Vm পরিমাপের মাধ্যমে কোনভাবেই অ্যাকশন পটেনশিয়ালে আসলে কি কি ঘটছে তা অনুধাবন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিক নিয়ে আসে এই অসাধ্যকেই সাধ্যের সীমানায়। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যা অ্যাক্সনের মেমব্রেনের একটি ক্ষুদ্র ক্ষেত্রফল বিশিষ্ট এলাকার বিভবকে নিয়ন্ত্রণ যোগ্য করে পরিণত করে সম-বিভব বিশিষ্ট অঞ্চলে। আর ভোল্টেজ ক্যাম্প এই কাজটি করে ছোট্ট একটি ইলেক্ট্রনিক ফিডব্যাক সার্কিটের মাধ্যমে। এই ইলেক্ট্রনিক ফিডব্যাক সার্কিটটি যখনই ভোল্টেজ পরিবর্তনের উপক্রম হয়, তখনই কিছু পরিমাণ তড়িৎ প্রবাহ ঘটিয়ে বা শোষণ করে, ভোল্টেজকে ফিরিয়ে আনে আগের জায়গায়।

চিত্রঃ ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প পদ্ধতি (মূল উৎসঃ Cole, KS(1968), Membranes, Ions, Impulses: A Chapter of Classical Biophysics.)
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প টেকনিকে প্রথমে স্কুইডের ১ মিলিমিটার ব্যাসের প্রশস্ত অ্যাক্সনের একটা খণ্ডাংশ নিয়ে তার কোষস্থ তরলে একটি ইলেক্ট্রোড এবং আরেকটি ইলেক্ট্রোড কোষের বহিস্থ তরলে স্থাপন করা হয়, যা পরীক্ষার সুবিধার্থে সামুদ্রিক পানি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। এই দুটি ইলেক্ট্রোড (রেকর্ডিং ইলেক্ট্রোড এবং রেফারেন্স ইলেক্ট্রোড) অ্যাক্সনের মেমব্রেন পটেনশিয়াল, অর্থাৎ কোষের বহিস্থ তরলের সাথে কোষস্থ তরলের বিভব পার্থক্য, Vm নির্ণয় করে। ভোল্টেজ ক্ল্যাম্পের কাজ যেহেতু মেমব্রেন ভোল্টেজকে কোন একটি নির্ধারিত মানে স্থির করে রাখা। ধরে নিলাম, সেই নির্ধারিত মানটি হচ্ছে Vc। এটি মেমব্রেন পটেনশিয়ালকে (Vm) এরপর কমান্ড ভোল্টেজের (Vc) সাথে তুলনা করা হয়। যদি মেমব্রেন ভোল্টেজ আর কমান্ড ভোল্টেজের মধ্যে পার্থক্য থাকে তাহলে, বিপরীত দিক থেকে একটি কারেন্ট পাসিং ইলেক্ট্রোড দিয়ে কোষের অন্তস্থ তরলে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করে, যা কমান্ড ভোল্টেজের সাথে মেমব্রেন ভোল্টেজের পার্থক্য শূন্যকরণ করবে। কিন্তু কত টুকু কারেন্ট পাস করবে? কিভাবে বিভব পার্থক্য শূন্যে নিয়ে আসে?
গাণিতিক সমস্যা সমাধানের মত করে ধরে নিলাম, t1 মুহূর্তে মেমব্রেন ভোল্টেজ Vm1=Vc, অর্থাৎ মেমব্রেন পটেনশিয়াল কমান্ড ভোল্টেজের সমান। কিন্তু Vm1 রেস্টিং পটেনশিয়াল নয়। মেমব্রেন ভোল্টেজ যখনই রেস্টিং পটেনশিয়াল ছাড়া অন্য কোন মানে থাকে তখন মেমব্রেনের প্রবণতা থাকে কিছু আয়ন ভিতরে-বাহিরে আদানপ্রদান করে মেমব্রেন পটেনশিয়ালের মান রেস্টিং পটেনশিয়ালে ফিরিয়ে আনা। সুতরাং, Vm1ভোল্টেজে মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে কিছু তড়িৎ প্রবাহ ঘটবে। যার ফলে ধরি I পরিমাণ বিদ্যুৎ তথা +q (=Im x t) পরিমাণ চার্জ মেমব্রেন অতিক্রম করে কোষস্থ তরলে প্রবেশ করেছে। ফলে, t2 মুহূর্তে দেখা গেল, মেমব্রেন ভোল্টেজ Vm2 হয়ে গেছে, যা Vc এর সমান নয়। এদের বিভব পার্থক্য ΔV= Vc-Vm2, যা ক্ল্যাম্প অ্যামপ্লিফায়ারকে নির্দেশ দিল, Im পরিমাণ কারেন্ট আরেকটি ইলেক্ট্রোডের মধ্য দিয়ে কোষের মধ্যে প্রবেশ করাতে। যেহেতু I পরিমাণ কারেন্ট প্রবাহের কারণে মেমব্রেন পটেনশিয়ালের পরিবর্তন ঘটেছে, তাই একে যদি কমান্ড ভোল্টেজে ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে অবশ্যই কোষস্থ তরলে I এর বিপরীত এবং সমান পরিমাণ কারেন্ট Im সরবারহ করতে হবে যা পূর্ববর্তী পরিবর্তনের প্রভাবকে শুন্যকরণ করতে পারবে । সুতরাং,
Im=- I.
ফলশ্রুতিতে কোষের মধ্যে প্রবেশ করা -q (=-Im x t) পরিমাণ চার্জের প্রভাবে মেমব্রেন ভোল্টেজ Vm1 এ ফিরে যাবে। এই প্রক্রিয়ায়, ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প সর্বদা, মেমব্রেন ভোল্টেজকে কমান্ড ভোল্টেজের সমান রাখতে পারে।
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্পের মাধ্যমে জানা গেল, Vm1 এর দরুন মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে I=-Im পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয়, কোষের দুই পাশের তরলের মধ্যে আয়নের আদান-প্রদানের মাধ্যমে ঘটেছে। ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প পরীক্ষণকালে মেমব্রেনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কারেন্ট ক্যাপাসিটিভ কারেন্ট না আয়নিক কারেন্ট তা অনুধাবন করা সম্ভব সময়ের সাপেক্ষে কারেন্টের গ্রাফ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, যেখানে দেখা যায়, যে মুহূর্তে পটেনশিয়াল পরিবর্তিত হচ্ছে, ঠিক সেই মূহুর্তে সম্পূর্ণ কারেন্টই ক্যাপাসিটিভ কারেন্ট, যা খুবই ক্ষণ স্থায়ী, এরপর আস্তে আস্তে আয়নিক কারেন্টের পরিমাণ বাড়তে থাকে আর ক্যাপাসিটিভ কারেন্ট শূন্য হয়ে যায়, অর্থাৎ ক্ষণস্থায়ী ক্যাপাসিটিভ কারেন্ট পরিবর্তিত হয়ে আয়নিক কারেন্টে পরিণত হয়।
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প প্রক্রিয়া পরিমাপকৃত কারেন্ট I থেকে নির্ণয় করা যায় প্রবাহিত চার্জের পরিমাণ, q (=I x t). নির্ণয় করা হয়েছে ΔV= Vc-Vm2, যেখান থেকে নির্ণয় করা হয় মেমব্রেনের ক্যাপাসিটেন্স, C=q/ΔV. নীচের ছবিটি থেকে আরও ভালো ভাবে বোঝা যাবে, যে ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প প্রক্রিয়ায়, ক্যাপাসিটিভ কারেন্ট, আয়নিক কারেন্ট নির্ণয় করা সম্ভব।
চিত্রঃ ক) অ্যাকশন পটেনশিয়াল ঘটাকালে প্রবাহিত ক্যাপাসিটিভ ও আয়নিক কারেন্ট। খ) পটাশিয়াম জনিত আয়নিক কারেন্ট। গ) সোডিয়াম জনিত আয়নিক কারেন্ট।
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্প পদ্ধতি ব্যবহার করে, একটি নির্দিষ্ট ভোল্টেজে মেমব্রেনের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত আয়নিক কারেন্টের পরিমাণ, ক্যাপাসিটিভ কারেন্টের পরিমাণ, মেমব্রেনের ক্যাপাসিটেন্স জানা সম্ভব। উপরের ছবিটাতে পরিষ্কার ভাবেই বোঝা যাচ্ছে, খুব স্বল্প সময়ের (০.০২ মিলি সেকেন্ড- যে সময়টুকুর মধ্যে পটেনশিয়ালের পরিবর্তিত হয়ে যায়) জন্য উপস্থিত ক্যাপাসিটিভ কারেন্টের স্পাইকের পরই তা রূপান্তরিত হয়েছে আয়নিক কারেন্টে, অর্থাৎ প্রথম ০.০২ মিলি সেকেন্ডের পরে সম্পূর্ণ কারেন্টই আয়নিক কারেন্ট। আয়নগুলোর মধ্যে সোডিয়াম এবং পটাসিয়াম আয়নের প্রাধান্য থাকায় এই আয়নিক কারেন্টকে আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়, অন্য নগণ্য পরিমাণ আয়নকে উপেক্ষা করে।
I= INa1+Ik1
এখন যদি, পটাসিয়াম আয়নের দরুন সৃষ্ট কারেন্টে কোনভাবে বন্ধ করা যায়, তাহলে প্রবাহিত কারেন্ট হবে কেবল সোডিয়াম আয়নের প্রবাহের জন্য সৃষ্ট কারেন্ট। বিপরীত ভাবে সোডিয়াম আয়নের দরুন সৃষ্ট কারেন্টকে যদি বন্ধ করা যায়, তাহলে আমরা কেবল মাত্র পটাশিয়াম আয়নের জন্য ঘটিত কারেন্টটা পাব। অর্থাৎ একটি আয়নের চলাচল বন্ধ করে দিলে অপর আয়ন ঘটিত কারেন্টটি পাওয়া যায়। হডজকিন -হাক্সলি, পরীক্ষণের সময়, কোষের বহিস্থ তরল সামুদ্রিক পানি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছিলেন, শুধু তাই নয়, সামুদ্রিক পানিতে বিশুদ্ধ পানি মিশিয়ে লবনাক্ততার পরিমাণ কমিয়েও পরীক্ষা করেছিলেন। কেবল মাত্র পটাশিয়াম আয়ন ঘটিত কারেন্ট সনাক্ত করার জন্য তাদের হাতে উপায় ছিল বহিস্থ তরলে সোডিয়ামের পরিমাণ শূন্য করে ফেলা (০% সামুদ্রিক পানি) অর্থাৎ সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ পানি বহিস্থ তরল হিসেবে ব্যবহার করা, যাতে কোন সোডিয়াম আয়নের উপস্থিতি না থাকে। যখন বহিস্থ তরল থেকে সোডিয়াম অপসারণ করে নেয়া হয়, তখন কেবল মাত্র পটাশিয়াম আয়নের দরুন সৃষ্ট আয়নিক কারেন্ট পাওয়া যায়, উপরের ছবির দ্বিতীয় কার্ভটি তাই নির্দেশ করছে। তার নীচের কার্ভটিতে দেখানো হয়েছে সোডিয়াম জনিত আয়নিক কারেন্ট, যা পাওয়া গেছে মোট কারেন্ট থেকে পটাসিয়াম কারেন্টকে বিয়োগ করে। বর্তমান সময়ে একটি আয়নিক কারেন্টের পরিমাণ জানতে হলে অপর আয়নের চ্যানেল বন্ধ করে দিতে ব্যবহার করা হয় কিছু রাসায়নিক পদার্থ; সোডিয়াম চ্যানেল গুলো ব্লক করার কাজে ব্যবহার করা হয় টেট্রোডক্সিন আর টেট্রামিথাইল অ্যামোনিয়ামকে ব্যবহার করা হয় পটাসিয়াম চ্যানেল ব্লক করার কাজে। একটি পরীক্ষণের এই দুটি আয়ন চ্যানেলের যে কোন একটি ব্লক করলেই কাজ চলে যায়।
কোষপর্দার ইলেকট্রিকাল মডেলে আরেকবার চোখ বুলিয়ে দেখি, সার্কিটে কিছু ব্যাটারির অস্তিত্ব দেখা যাচ্ছে, সেগুলো এলো কি করে? কোষের ভিতরে বা বাহিরে জমা থাকে প্রচুর আয়ন, প্রধানত সোডিয়াম আয়ন এবং এবং পটাসিয়াম আয়ন। কোষের ভিতরে পটাসিয়াম আয়নের ঘনত্ব বেশী থাকে আর বাইরে সোডিয়াম আয়নের ঘনত্ব বেশী থাকে। তাই সুযোগ পেলেই পটাসিয়াম আয়ন কোষের ভিতর থেকে বাইরের দিকে যেতে চায় আর সোডিয়াম আয়ন কোষের বাইরে থেকে ভিতরে চলে আসতে চায়। এই যে কোষপর্দা দিয়ে সোডিয়াম আয়নের প্রবাহ বা পটাসিয়াম আয়নের প্রবাহ বা আয়নিক কারেন্ট, তা ঘটছে তাদের রাসায়নিক ঘনত্বের ভিন্নতার কারণে। এই রাসায়নিক ঘনত্বের ভিন্নতা কোষপর্দার দুইপাশে বিভব পার্থক্য সৃষ্টি করে বলে সেই বিভবকে ইলেক্ট্রো-কেমিক্যাল ফোর্স হিসেবে বিবেচনা করা যায়, আর যে বিভবে গেলে আয়নগুলোর প্রবাহ সাম্যাবস্থায় থাকবে, সেই বিভবকে ব্যাটারি আকারে দেখানো হয় ইলেকট্রিকাল মডেলে, কারণ সেই বিভবটিই হল আয়নগুলোর চালক-শক্তি। এইসব ব্যাটারিকে বলা হয় ইকুইলিব্রিয়াম পটেনশিয়াল বা রিভার্সাল পটেনশিয়াল। সোডিয়ামের রিভার্সাল পটেনশিয়াল ENa হল সেই পটেনশিয়াল যে পটেনশিয়ালে সোডিয়াম আয়নের জন্য যে পটেনশিয়ালে সোডিয়ামের রাসায়নিক ঘনত্ব এবং ইলেক্ট্রোমোটিভ ফোর্স উভয়ই পরস্পরের সাথে সাম্যাবস্থায় থাকে, একে অধিকাংশ সময় সোডিয়ামের নার্নেস্ট পটেনশিয়াল হিসেবে উল্লেখ করা হয়। নার্নেস্ট সমীকরণ ব্যবহার করে খুব সহজেই নির্ণয় করা যায় একটি বিশেষ আয়নের রিভার্সাল পটেনশিয়াল।
ভোল্টেজ ক্ল্যাম্পের মাধ্যমে আয়নিক কারেন্টের পরিমাণ জানার মাধ্যমে প্রত্যেকটি আয়নের জন্য আলাদা আলাদা করে জানা যায় কোষ পর্দার পরিবাহকত্বের পরিমাণও। তবে মনে রাখতে হবে এরা ভোল্টেজ এবং সময় নির্ভর, মূলত একেকটি ফাংশন (ভোল্টেজ, সময়)। নীচে আয়নিক কারেন্ট থেকে পরিবাহকত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি দেখানো হল।
INa= gNa(Vm-ENa)
উপরের সমীকরণ থেকে আমরা পাচ্ছি নার্ভ মেমব্রেনে সোডিয়াম আয়নের পরিবাহকত্ব, gNa.
gNa= INa/(Vm-ENa)
ঠিক অনুরূপ ভাবে নির্ণয় করা যায় gk
তাহলে দেখা যাচ্ছে, INa, Ik, gNa, gk , C, ENa, Ek সবই নির্ণয় করা যায়। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে হডজকিন-হাক্সলির নিউরন মেমব্রেনের মডেলটি আক্ষরিক অর্থে সম্পূর্ণ পরিমাপযোগ্য, যা নিউরোসায়েন্সকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিমাপযোগ্য বিজ্ঞানের তালিকায়। এভাবেই কনডাক্টেন্সের সাথে সিরিজে একটি করে ব্যাটারি, আর এদের প্যারালালে ক্যাপাসিটর বসিয়ে হডজকিন হাক্সলি উপস্থাপন করেছিলেন মেমব্রেনের ইলেকট্রিকাল বৈশিষ্ট্য, যেখানে মেমব্রেনের দুইপাশের বিভব পার্থক্যই হল মেমব্রেন পটেনশিয়াল। যখন কোষ স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে, তখন কোষের পরিবাহকত্বও স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু কোন কারণে কোষের দুইপাশের জমা আয়নে অস্থিতিশীলতা চলে এলেই মেমব্রেন পটেনশিয়াল বদলে যায়, আর কোষের পরিবাহকত্বও পরিবর্তনশীল হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয় অ্যাকশন পটেনশিয়াল। তাদের লব্ধ এই সব জ্ঞানকে তারা নিউরনের কোষপর্দার ইলেকট্রিকাল মডেল রূপে উপস্থাপন করিয়েই সমগ্র বিশ্বকে অনুধাবন করিয়েছিলেন, নিউরন আসলে কি? স্নায়ুতন্ত্রের ফাংশনাল ইউনিটের কর্মপ্রক্রিয়ার স্বরূপ।
——————————————————————————–
[বেশ কয়েক পর্বে নিউরন এবং এর কার্যপ্রণালী ব্যাখ্যা করার কারণটি ছিল ছিল নিউরাল মেকানিজমকে ভালভাবে জানা, যার উপর ভিত্তি করে বুঝতে হবে পুরো স্নায়ুতন্ত্রকে, এর কাজকে। এই পর্যন্ত এসে বুঝতে পারছি, নিউরন এবং অ্যাকশন পটেনশিয়াল নিয়ে লিখে যেতে থাকলে হয়ত শেষ করতে পারব না। তবে আশার কথা হচ্ছে, অভিজিৎ দার মস্তিষ্কের আনইন্টিলিজেন্ট ডিজাইন নিয়ে লেখাটায় দেখলাম, ভাইয়া অ্যাকশন পটেনশিয়াল সঞ্চালন, কেবল থিওরি (তথ্য চুইয়ে পড়া) নিয়ে লিখবেন, আমি নিশ্চিন্ত মনে আপাতত নিউরন নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ করছি। নিউরনকে বুঝতে গেলে শুধু বায়োলজির জ্ঞান দিয়ে আর বেশী দূর টেনে নেয় সম্ভব নয়, এইবার দরকার গণিতের জ্ঞান। হডজকিন- হাক্সলির মূল প্রবন্ধে যত গাণিতিক সমীকরণ আছে, সেগুলো যেদিন নিজে বুঝতে এবং অন্যকে বোঝাতে সমর্থ হব, সেদিন না হয় আবার শুরু করব নিউরন নিয়ে আলোচনা-যজ্ঞ। সামগ্রিক অর্থে এতো বিশাল, এতো নিখুঁত, এতো শ্রম সাপেক্ষ কাজ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবার জন্য আমার মত একজন শিক্ষানবিশকে যথেষ্টই সাধনা করতে হবে।
নিউরন নিয়ে আমার সব লেখালেখি সেই সব তরুণদের উদ্দেশ্যে, যারা জানতে চায় মস্তিষ্কের রহস্যকে। একটা অবিশ্বাস্য ধরণের কৌতূহল উদ্দীপক জ্ঞানের চারণভূমি পড়ে আছে, যার অধিকাংশ রহস্যই এখনো উন্মোচিত হয়নি, একদিন হয়ত বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম হাত লাগাবে সেই রহস্য উন্মোচনে। আমি আশাবাদী।]
———————————————————————————-
তথ্যসূত্রঃ
1. Hodgkin, A.L. & Huxley, A.F. A quantitative description of membrane current and its application to conduction and excitation in nerve. The Journal of Physiology 117, 500-544 (1952).
2. Cole, K.S. & Curtis, H.J. ELECTRIC IMPEDANCE OF THE SQUID GIANT AXON DURING ACTIVITY. The Journal of general physiology 22, 649-670 (1939).
3. Hodgkin, A.L., Huxley, A.F. & Katz, B. Measurement of current-voltage relations in the membrane of the giant axon of Loligo. Journal of Physiology 116, 424-448 (1952).
4. Huxley, A.F. Hodgkin and the action potential 1935–1952. The Journal of Physiology 538, 2 (2002).
5. The Nerve Impulse.
6. Hodgkin-Huxley Experiments
7. Active Behavior of the Cell Membrane

Saturday, May 5, 2012

মডেল

আমার বন্ধু তনু, বুয়েটে পড়াকালে এই মেয়েকে দেখতাম শুধু দৌড়ের উপর থাকতো। আর সাথে একটি কথা, যাই রে, মডেলের জন্য কাজ করতে হবে। না ভাই, এই মডেল সেই বিজ্ঞাপনের মডেল না, এই মডেল হল স্থাপত্য প্রকল্পের জন্য ডিজাইন করা মডেল। ধরুন  একটা স্কুলের নকশা তৈরী করবে, কেমন হবে স্কুলের ক্লাসরুম, কেমন হবে তার চত্ত্বরটি, কোনদিকে থাকবে এর মুখটি ঘোরানো, এইসব আরকি কিছু পরিচিত চিহ্নের সাহায্যে প্রকাশ করা, যা দেখলেই সব স্থপতি আর পুরকৌশলীরা বুঝে ফেলবে, নকশাকারী কেমন নকশার কথা ভাবছে। অটোক্যাডে সেসব নকশা করে তা আবার ফোমবোর্ড কেটে কেটে স্কুল বা হাসপাতাল বা বহুতল ভবনের একটা আপাত প্রতিকৃতিও বানিয়ে ফেলতো ওরা। বুয়েটে আমার হল জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে আমার তনুর সাথে, স্থাপত্যকলার শিক্ষার্থীদের সাথে। আমি মোটামুটি আধা না হলেও সিকি ভাগ বুঝি স্থাপত্যকলার ব্যাপার স্যাপার। তবে আমি সচেতন একটি ব্যাপারে, ভুল করেও সবজান্তা বাঙ্গালীর মত স্থপতিগিরি ফলাতে যাবো না।

তনুর সাথে কাটানো সেই দিনগুলোর এক অদ্ভুত ধরণের সৃত্মি জমা আছে আমার মনের মধ্যে। তনুর কাছ থেকে আমি শিখেছি একধরণের পর্যবেক্ষণ। আমি আর তনু বিকেলে যখন রাস্তায় হাঁটতে বেরুতাম, ওকে দেখতাম, রাস্তার পাশের টুকরো টুকরো জিনিশ থেকে আস্ত জিনিস সবকিছু কি গভীর মনোযোগ দিয়ে খেয়াল করছে। বিকেলের সেই ভ্রমনে আমাদের কোন বাধাধরা সময় সীমা ছিল না, ধীর পদক্ষেপে আমরা হাটতাম, গল্প করতাম, এটা ওটা আলোচনা করতাম। আর সাথে চলত সেইসব আপাত তুচ্ছ জিনিসের পর্যবেক্ষণ। কোন এক পুরনো নোনা ধরা দেয়ালে হয়তো একটি বড় ফাটল, তার ফোকরে ফোকরে শেওলা, দেখার চোখ থাকলে সেই ফাটলই হয়ে ওঠে তথ্যের খনি। আচ্ছা, ফাটলটা এমন কোনাকুনি কেন? ইঞ্জিনিয়ারিং বা স্থাপত্যের শিক্ষার্থী হলে জানার কথা, এটা কোন মামুলি প্রশ্ন নয়, এই একটি ফাটলের জন্য পুরো ভবনের নকশা থেকে শুরু করে নকশাকারীকে পর্যন্ত নাস্তানাবুদ করে ছাড়া যায়। যমুনা সেতুর ফাটল নিয়ে হাজারো সমালোচনার মুখে আছে সেতুর নকশাকারী, প্রকৌশলীরা।

পায়ের কাছে পড়ে আছে হয়ত একটা ছোট্ট কাঁচের টুকরো, এটাকে কি করে মনোহরী শিল্পে রূপান্তরিত করা যায়, তা ভাবার বিষয় বটে। অথচ, জিনিসগুলো বেখেয়ালে কত তুচ্ছই না মনে হয়। এইভাবে নিজের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য তুচ্ছ জিনিসের মাঝ থেকে জ্ঞানটুকু, সুন্দরটুকু খুঁজে নিতে শিখেছিলাম তনুর কাজ থেকে। এখন আর আমাদের একসাথে হাঁটা হয় না বিকেলের মায়াবী আলোয়, কিন্তু তনুর কাছ থেকে পাওয়া অভ্যাসটা আমাকে ছেড়ে যায় না একটি মুহুর্ত।

তনুকে দেখতাম, যেকোন প্রজেক্টের মডেলের প্রথম সরলরেখাটা টানার আগে সে বিষয় নিয়ে করত বিস্তর পড়ালেখা। দরকারে যেতো প্রজেক্ট সাইটে। সঙ্গে থাকতো ডায়রী, পেন্সিল, ক্যামেরা। কাজে বসবার আগে কাজের পরিকল্পনাটা করে নিতো যথাসম্ভব নিখুত ভাবে। ১৪ সপ্তাহের সময় সীমা আছে মাথার ভিতরে, তবুও ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনাটা করতে না পারলে কাজের কাজটি হবে না যে।

আমি তনুর কাছে ঋণী, যখন আমি কেবলই একজন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্রী ছিলাম, গবেষণার সাথে সম্পৃক্ত হইনি, তখনই ও আমাকে দেখিয়েছিল কিভাবে করতে হয় কাজ। ঋণী আমার প্রফেসরের কাছেও, যিনি আমাকে গবেষক হিসেবে গড়ে তুলতে দিয়ে যাচ্ছেন শ্রম। গবেষক মানেই নয় বিশাল কিছু করে ফেলা, বরং প্রথমত অনুসন্ধানে নিয়োজিত হতে শেখা।

এখন আমাকেও ভাবতে হয় তনুর মত, একটা মডেলএর কথা। অটোক্যাডে একে নয়, প্রজেক্ট সাইটে গিয়ে নয়, কূল কিনারা হীন জ্ঞানের চারনভূমি চষে নিজের মাঝে গড়ে তোলা একটা অন্তর্দৃষ্টি যা দিয়ে আমি গড়র আমার মডেল, গাণিতিক নকশা।

Tuesday, March 13, 2012

দুখঃবোধেরা বজায় থাকুক চিরকাল

এক একজন মানুষ হঠাৎ হঠাৎ ভালোবাসতে শিখে যায়।
আর তাতেই, তাতেই ঘনিয়ে আসে তার সব দুর্দশা।
ভালোবাসতে না জানা মানুষগুলো হেসে হেসে লুটোপুটি খায়।
বলে কিনা, দেখ দেখ, আবেগ যেন গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
তারা অন্তরে জ্বলে পুড়ে মরে,
ভালোবাসতে জানা মানুষটার শুদ্ধতায়।
নির্জনে ভাবে, মানুষটা ভালো...
আমাদের মত এখনো মরেনি অন্তরে।
এখনো হয়নি সে শকুনের গ্রাস!

Monday, February 20, 2012

জৈবিক বুদ্ধিমত্তার নিরিখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা


মানুষ এই পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রাণী, কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহারে মানুষ অনেক উন্নত একথা সত্যি হলেও বিস্ময়কর ভাবে আমাদের মস্তিষ্কটিই আমাদের কাছে বিরাট একটি বিস্ময় রয়ে গেছে। আমরা এখনো জানতে পারিনি, ঠিক কি ঘটছে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে। আকাশের তারা দেখে যতটা ভাবনায় ডুব দিয়েছি, তার চেয়েও বিস্ময়কর ব্যাপার কিভাবে আমরা ভাবছি? কিভাবে শিখছি, কিভাবে সৃষ্টি করছি শিল্পের সব বিমূর্ত ধারণা? জানিনা, তবে থেমে নেই আমাদের জানার চেষ্টা। বিগত শতাব্দীর অনেকটা সময় জুড়েই মানুষের ধারনা ছিল, মানুষের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে কি ঘটছে, তা জানা প্রায় অসম্ভব। চিকিৎসাবিজ্ঞানে হিউম্যান এনাটমী যেরকম যুগান্তকারী ভুমিকা রেখেছে, ততখানি গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা নিউরোএনাটমি নিউরোসায়েন্সে রাখতে পারেনি। তার প্রধান কারনগুলোর মধ্যে পড়ে, মস্তিষ্ক বা নার্ভাস সিস্টেম মানব দেহের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ, যার ন্যূনতম বিচ্যুতির কারনে মানুষের কার্যক্রমে বড় রকমের প্রভাব পড়তে পারে। তার দরুন বর্তমান সময়ে এসেও আমরা সরাসরি জীবিত মানুষের মস্তিষ্কে কোন ইলেক্ট্রনিক প্রোব বসাতে পারিনা, মস্তিষ্কের কার্যক্রম বুঝতে গিয়ে যাতে মস্তিষ্কের ক্ষতি না হয়ে যায়, সেই দিকে সবসময় লক্ষ্য রাখতে হয়। মানব দেহ যতটুকু অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক প্রবাহ সহ্য করতে পারে, সেই সীমার মধ্যে আমাদের এক্সপেরিমেন্ট গুলো চালাতে হয়। কারণ মস্তিষ্কের একটি কোষও যদি ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তা আর পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। মানবেহের অন্য সব কোষের স্বতঃস্ফূর্ত পুনঃস্থাপন প্রক্রিয়া থাকলেও নিউরণের নেই। তাই মস্তিষ্কের আঘাত বা কোন রকম ক্ষতিকে এড়ানোর সর্বোচ্চ চিন্তা মাথায় রেখেই কাজ করতে হয় এখানে। এখনও পর্যন্ত অনেক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় সাবজেক্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয় মানুষের নিকট আত্মীয় শিম্পাঞ্জী বা বানরকে। মানুষের মৃত্যুর পর পরই এর জৈব কোষগুলোর পচন প্রকিয়া শুরু হয়ে যায়। তখন মস্তিষ্ক কেটেকুটে দেখেও খুব বেশী লাভ নেই, সমস্ত স্নায়ুতন্ত্র জুড়েই নিউরণ ও তার এক্সনগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিন্তু মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের নিউরাল অ্যাকটিভিটি বন্ধ হয়ে গেছে। এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা এবং সেই সাথে মানুষের অর্জিত জ্ঞানের অভাবের কারনেই  একটা সময় পর্যন্ত বিজ্ঞনীদের ধারনা ছিলো, মস্তিষ্ক নামের এই ব্ল্যাক বক্সটার প্রকৃত কার্যপ্রণালী জানা সম্ভব নয়। কিন্তু মানুষের আগ্রহ কি তাই বলে থেমে থাকতে জানে?

জেনেটিক-মেমেটিক কো-এভোলিউশন (শেষার্ধ)


সেই আদিম মানুষ, যার শরীর আবৃত ছিল এক স্তর লোমে, খুঁজে খুঁজে পশু শিকারের জন্য বেছে নিয়েছিল ধারালো পাথর, পাথরে-পাথরে ঠোকাঠুকিতে জ্বালিয়ে ফেলেছিল অগ্নিস্ফুলিঙ্গ, সে কি নিজেকে জিজ্ঞেস করেছিল, কেন আমি সবার চেয়ে আলাদা? কিংবা সুন্দরবনের শিকারী বাঘ, ক্ষুধা মেটাতে যে অভাবনীয় মাত্রার দ্রুতগতি আর শারীরিক শক্তিতে অনায়াসে ঘায়েল করে ফেলছে বুনো হরিণ, সে কি নিজের কাছে কখনো জানতে চেয়েছে, আমি কি করে এতো দ্রুত ছুটতে পারি? এই “আমি” বোধটি কি আসলেই উপস্থিত ছিল আমার আদিম পূর্বপুরুষের মাঝে বা শক্তিশালী বাঘের মস্তিষ্কে? এই প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর আমার জানা নেই। তবে এটুকু জানা আছে… মানুষ নিজেকে প্রশ্ন করেছে, আমি কে? কোথা থেকে এলাম, কিভাবে এলাম? আত্মপরিচয় সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর-পর্বের শেষে মানুষ এখন আছে ‘কেন আমি আলাদা?’ এই প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে।